নিপা ভাইরাস: আতঙ্ক নয়, সচেতনতায় মিলবে সুরক্ষা
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে নতুন করে নিপা ভাইরাস নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বাদুড় বা পশুপাখির মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং মৃত্যুহারের দিক থেকেও বেশ ভীতিপ্রদ। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক তথ্য জানা থাকলে এই রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।
নিপা ভাইরাস আসলে কী?
নিপা ভাইরাস (Nipah Virus) একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা মূলত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হলো ‘ফ্রুট ব্যাট’ বা এক বিশেষ প্রজাতির ফলখেকো বাদুড়। দূষিত খাবার বা সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমেও এটি ছড়িয়ে পড়ে।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ কীভাবে ঘটে?
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ প্রধানত তিনটি উপায়ে হতে পারে:
- বাদুড়ের মাধ্যমে: বাদুড়ের লালা বা মল লেগে থাকা কাঁচা খেজুরের রস পান করলে বা বাদুড়ের আধখাওয়া ফল খেলে।
- আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে: আক্রান্ত শুকর বা অন্য কোনো গবাদি পশুর সংস্পর্শে এলে।
- মানুষ থেকে মানুষে: আক্রান্ত ব্যক্তির থুতু, লালা বা শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালের কর্মী বা পরিবারের সদস্যরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

নিপা ভাইরাস রোগের লক্ষণ
এই রোগের উপসর্গগুলো অনেক সময় সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মনে হতে পারে, যার ফলে শনাক্ত করতে দেরি হয়। নিপা ভাইরাস রোগের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়:
- প্রাথমিক লক্ষণ: তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং বমি বমি ভাব।
- শ্বাসকষ্ট: অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
- মস্তিষ্কের ক্ষতি (Encephalitis): রোগ বাড়লে রোগী তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, বিভ্রান্তি দেখা দেয় এবংএক পর্যায়ে খিঁচুনি হয়ে কোমায় চলে যেতে পারে।
যদি আপনার এলাকায় ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থাকে এবং এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা ও বর্তমান পরিস্থিতি
দুর্ভাগ্যবশত, এখনো পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা হিসেবে কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত ‘সাপোর্টিভ কেয়ার’ বা লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল।
- আইসোলেশন: রোগীকে দ্রুত আলাদা রাখা।
- হাইড্রেশন: শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা।
- জরুরি সেবা: অবস্থা গুরুতর হলে আইসিইউ (ICU) বা ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়া।
সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসার জন্য রাজ্যের কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধির সেরা হাসপাতাল হিসেবে বেলেঘাটা আইডি হাসপাতাল (Beleghata ID Hospital) আমাদের রাজ্যে অগ্রগণ্য। সেখানে এই ধরনের রোগের জন্য বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
নিপা ভাইরাস: আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই হোক প্রতিরোধের মূলমন্ত্র
আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করলে এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। নিপাহ ভাইরাস হলে করণীয় বা প্রতিরোধে করণীয় ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. কাঁচা খেজুরের রস বর্জন করুন
শীতকালে খেজুরের রস অত্যন্ত জনপ্রিয়, কিন্তু মনে রাখবেন বাদুড় এই রসের হাঁড়িতে মুখ দেয়। তাই কাঁচা খেজুরের রস পান করা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। রস ফুটিয়ে গুড় তৈরি করে খেলে কোনো সমস্যা নেই।
২. ফল খাওয়ার আগে সতর্কতা
গাছ থেকে পড়া বা পাখির আধখাওয়া ফল কখনো খাবেন না। যেকোনো ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া নিরাপদ।
৩. হাত ধোয়ার অভ্যাস
বাইরে থেকে ফিরে বা খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করাও বেশ কার্যকর।
৪. আক্রান্তের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
যদি কেউ নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তবে তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। পরিচর্যার ক্ষেত্রে মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
কেন এই ভাইরাস নিয়ে এত আতঙ্ক?
রাজ্যজুড়ে এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর উচ্চ মৃত্যুহার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার ৪০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া এর সঠিক ভ্যাকসিন না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি বেশি কাজ করে। তবে স্বাস্থ্য দপ্তরের কড়া নজরদারি এবং প্রচারের ফলে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা ও জরুরি পরিষেবা
বর্তমানে নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক এবং সাপোর্টিভ। যেহেতু এই ভাইরাস দ্রুত মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, তাই ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণ বা ICU সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি ক্ষেত্রেও বেশ কিছু আধুনিক হাসপাতাল এই লড়াইয়ে প্রস্তুত রয়েছে।
এই ধরণের ভাইরাস সংক্রামক ব্যাধির জন্য এস্ক্যাগ সঞ্জীবনী (Eskag Sanjeevani Kolkata) সব সময় প্রস্তুত।
উন্নতমানের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের তালিকায় Eskag Sanjeevani (এসকাগ সঞ্জীবনী) বর্তমানে উত্তর কলকাতার অন্যতম হাসপাতাল। আমাদের অভিজ্ঞ ডাক্তার এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক পরিকাঠামো যেকোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় করতে সাহায্য করে। নিপা ভাইরাসের মতো পরিস্থিতিতে যেখানে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আইসোলেশন জরুরি, সেখানে এস্ক্যাগ সঞ্জীবনী হাসপাতাল রোগীদের মনে এবং জীবনে ভরসা এনে দিয়েছে।
কেন জরুরি অবস্থায় Eskag Sanjeevani-তে যোগাযোগ করবেন?
- ২৪/৭ জরুরি বিভাগ: যেকোনো সময় জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তার সুবিধা।
- উন্নত ICU ও ভেন্টিলেশন: নিপা ভাইরাসের জটিল পর্যায়ে শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণে যা অত্যন্ত কার্যকর।
- সঠিক রোগ নির্ণয়: তাদের প্যাথলজি ল্যাবে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।
নিপা ভাইরাস একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি হলেও, সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই আমাদের সেরা সুরক্ষা। গুজবে কান না দিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা মেনে চলুন। মনে রাখবেন, রোগ লুকিয়ে রাখলে বিপদ বাড়ে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে প্রাণ বাঁচে।
না, এটি সরাসরি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছে থাকলে ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
সাধারণত RT-PCR পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এছাড়া এলিজা (ELISA) বা রক্ত পরীক্ষাও করা হতে পারে।
হ্যাঁ, সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং সঠিক শারীরিক যত্ন পেলে অনেকেই সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক সমস্যা থেকে যেতে পারে।
এখনো পর্যন্ত কাঁচা দুধ থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুধ ফুটিয়ে খাওয়াই শ্রেয়।

