রোগ প্রতিরোধ থেকে চিকেন পক্স—প্রকৃতির এক জাদুকরী সুপারফুড
প্রকৃতি আমাদের সুস্থ রাখার জন্য চারপাশে অসংখ্য ভেষজ উপাদান ছড়িয়ে রেখেছে। সজনে গাছ বা মরিঙ্গা অন্যতম এক সুপারফুড । অনেকেই একে মাল্টিভিটামিনের উৎস বলেও চিহ্নিত করেছে ।
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সজনে গাছে রয়েছে অনেক রোগের প্রতিষেধক এবং আজকের দিনে যা প্রমাণিত।
গরম কালে আমরা অনেকেই সজনে ডাটা খেয়ে থাকি তবে শীতের শেষে যখন বসন্ত আসে তখন দেখা মেলে সজনে ফুলের।
সজনে পাতার সাথে সাথে সজনে ফুলের বিশেষ উপকারী রয়েছে ।
সজনে গাছের পাতা, ছাল, ডাল, শিকড় এবং ফুল- প্রতিটি অংশই পুষ্টিগুণে ভরা ।
এক সময় গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে অযত্নে বেড়ে ওঠা এই সজনে গাছকে আজ বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ‘মিরাকল ট্রি’ বা ‘সুপারফুড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আজকের ব্লগে আমরা জানবো বসন্ত কালে সজনে পাতার পুষ্টিগুণ, সজনে পাতার বিশেষ উপকারিতা এবং এটি ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ।

সজনের ফুল বা ডাঁটার থেকে সজনে পাতার পুষ্টিগুণ বেশী
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সজনে ডাটা বাংলায় বাড়িতে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে – তা শুক্ত হোক বা সজনে ডাটা চচ্চড়ি। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন সজনে ডাঁটার থেকে সজনে পাতার পুষ্টিগুণ আরো বেশী।
এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়াম। এই কারণেই সজনে পাতাকে পুষ্টির পাওয়ার হাউজ বলা হয়।
এতে থাকা পুষ্টি উপাদান আমাদের সাধারণ অনেক খাবারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী। নিচে একটি ছোট তালিকা দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে:
- কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি।
- গাজরের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ভিটামিন এ।
- দুধের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম।
- কলার চেয়ে ৩ গুণ বেশি পটাশিয়াম।
- পালং শাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশি আয়রন।
এই অসামান্য পুষ্টির কারণেই এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
প্রতিদিন সজনে পাতা সঠিক পরিমানে খেলে BMI বাড়বে- কাজেই যাদের ওজন অনেক কম বা যাদের পুষ্টির ঘাটতি আছে তাদের জন্য মরিঙ্গা বা সজনে পাতা অত্যন্ত উপকারী।
মরিঙ্গা বা সজনে পাতা রোজ খাওয়ার উপকারিতা কী?
শীতের শেষে বা বসন্ত কালে সজনে ফুল বাজারে পাওয়া যায় এবং প্রায় সকলেই এটি খেয়ে থাকেন তবে সজনে পাতা খাওয়া যায় সারা বছর কারণ এটি সহজলভ্য ।
সজনে পাতার উপকারিতা বলে শেষ করা কঠিন।
উল্লেখযোগ্য কিছু গুণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে :
সজনে পাতায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি থাকে। এটি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে যার ফলে যেকোনো সংক্রমণ বা ভাইরাসজনিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
২. উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
যারা হাই ব্লাড প্রেশারে ভুগছেন, তাদের জন্য সজনে পাতা দারুন উপকারী। এটি রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে এবং শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
৩. রক্তশূন্যতা দূর করতে
এতে থাকা প্রচুর আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায়। বিশেষ করে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতায় ভোগা নারী ও শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
৪. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
সজনে পাতা রক্তে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে সজনে পাতার রস বা গুঁড়ো খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের উপকার হয়।
৫. হাড় ও দাঁতের সুরক্ষায়
প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকায় এটি হাড় মজবুত করে এবং বয়স্কদের হাড়ের ক্ষয় রোধে সহায়তা করে।
৬. চিকেন পক্স বা জলবসন্ত প্রতিরোধে (Chicken Pox)
বসন্তকালে Chicken Pox বা জলবসন্তের প্রকোপ বেড়ে যায়। সজনে পাতায় রয়েছে অ্যান্টি-ভাইরাল গুণ যা শরীরকে ভেতর থেকে জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। গ্রামাঞ্চলে এখনো জলবসন্ত প্রতিরোধে সজনে ফুল ও পাতা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে।
সজনে পাতার রস খেলে কী হয়?
অনেকেই জানতে চান সজনে পাতার রস খেলে কি হয়। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক থেকে দুই চামচ সজনে পাতার টাটকা রস খেলে শরীরের বিষাক্ত টক্সিন বের হয়ে যায় (Detoxification)। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং হজম শক্তি উন্নত করে। তবে সরাসরি রস খাওয়া কষ্টকর মনে হলে সামান্য মধুর সাথে মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
সজনে পাতার খাওয়ার নিয়ম কী ?
শহর অঞ্চলে টাটকা সজনে পাতা পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে সজনে পাতার পাউডার বা গুঁড়ো ব্যবহার করা সবচেয়ে সহজ। সজনে পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- গরম জলের সাথে: এক গ্লাস উষ্ণ গরম জলে ১ চা চামচ সজনে পাতার গুঁড়ো মিশিয়ে সকালে খালি পেটে পান করতে পারেন।
- স্মুদি বা জুসের সাথে: যেকোনো ফলের রস বা স্মুদির সাথে মিশিয়ে নেওয়া যায়।
- ডাল বা তরকারিতে: রান্নার শেষে ডাল বা সবজির ওপর সজনে পাতার গুঁড়ো ছিটিয়ে দিলে পুষ্টিগুণ অটুট থাকে।
- চা হিসেবে: চায়ের লিকারের সাথে আধা চামচ সজনে গুঁড়ো মিশিয়ে ‘মরিঙ্গা টি’ হিসেবে পান করা যায়।
সজনে পাতা গুঁড়ো কি খাওয়া যায়?
বাজারে বর্তমানে অর্গানিক সজনে পাতার গুঁড়োর বেশ চাহিদা রয়েছে। সজনে পাতার গুড়া দাম ব্র্যান্ড এবং মানের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। তবে কেনার সময় অবশ্যই সেটি খাঁটি এবং কেমিক্যালমুক্ত কি না তা যাচাই করে নেবেন।
সজনে পাতা সংরক্ষণের উপায়:
আপনি চাইলে বাড়িতেও সজনে পাতার গুঁড়ো তৈরি করতে পারেন:
- সজনে পাতা সংগ্রহ করে ভালো করে ধুয়ে নিন।
- রোদে না শুকিয়ে ঘরের ভেতর ছায়াযুক্ত স্থানে শুকিয়ে নিন (যাতে পুষ্টিগুণ নষ্ট না হয়)।
- পাতা মচমচে হয়ে গেলে ব্লেন্ডার বা হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে কাঁচের জারে সংরক্ষণ করুন।
অতিরিক্ত সজনে পাতা খাওয়ার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
১. হজমের সমস্যা বা পেটের গোলযোগ
২. রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়া (Low Blood Pressure)
৩. রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি কমে যাওয়া
৪. সজনে পাতা আয়রনের ভালো উৎস হলেও, সজনে গাছের ছাল বা শিকড় গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এটি জরায়ুর সংকোচনের কারণ হতে পারে।
৫. আপনি যদি লিভারের কোনো বিশেষ ওষুধ বা থাইরয়েডের ওষুধ খেয়ে থাকেন, তবে সজনে পাতা খাওয়ার আগে সাবধান হওয়া উচিত।
৬. সজনে পাতা নিরাপদ হলেও, এর শিকড়ে মোরিঙ্গিনিন (Moringinine) নামক এক ধরণের উপাদান থাকে যা স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পাতা ছাড়া গাছের অন্যান্য অংশ অতিরিক্ত সেবন করা থেকে বিরত থাকা ভালো।
সতর্কতা:
- পরিমাণ ঠিক রাখুন: প্রতিদিন ১ থেকে ২ চা চামচের বেশি সজনে পাতার গুঁড়ো খাওয়া উচিত নয়।
- বিরতি দিন: টানা কয়েক মাস খাওয়ার পর মাঝে কয়েক দিন বিরতি দেওয়া ভালো।
- খালি পেটে সতর্কতা: অনেকের খালি পেটে সজনে পাতার রস খেলে বমি বমি ভাব হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভরা পেটে খাওয়া ভালো।
স্বল্পমূল্যে পাওয়া সজনে পাতা সুপারফুডটি আমাদের সুস্থতার এক অনন্য চাবিকাঠি। সঠিক নিয়মে নিয়মিত সজনে পাতা গ্রহণ করলে আপনি কেবল রোগমুক্ত থাকবেন না, বরং আপনার কর্মক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই দেরি না করে আজই আপনার খাদ্যতালিকায় যোগ করুন সজনে পাতা।
হ্যাঁ, পরিমিত পরিমাণে (১-২ চা চামচ গুঁড়ো বা এক মুঠো পাতা) প্রতিদিন খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
সজনে পাতায় প্রচুর আয়রন ও ক্যালসিয়াম থাকে যা গর্ভবতী মায়েদের জন্য উপকারী। তবে অতিরিক্ত সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সজনে পাতা মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে, যা ওজন কমানোর যাত্রায় সহায়ক।
সজনে পাতায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি খাবেন না।
সজনে পাতায় গ্রাম প্রতি পুষ্টির পরিমাণ অন্য যেকোনো শাকসবজি বা ফলের তুলনায় অনেক বেশি। এতে ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের এমন এক দুর্লভ সংমিশ্রণ রয়েছে যা প্রকৃতিতে খুব কম পাওয়া যায়।
এতে প্রায় ৪৬ প্রকারের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে (যেমন: কোয়ারসেটিন এবং ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড), যা শরীরের কোষগুলোকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
সাধারণত শাকসবজিতে প্রোটিন কম থাকে, কিন্তু সজনে পাতায় প্রচুর পরিমাণে উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। এতে ১৮টি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে, যার মধ্যে ৯টিই শরীরের জন্য অপরিহার্য (Essential Amino Acids)।
সজনে পাতায় থাকা আইসোথিয়াসায়ানেটস (Isothiocyanates) শরীরে যেকোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ব্যথা কমাতে ওষুধের মতো কাজ করে।
সব ঋতুতে কার্যকর: এটি কেবল একটি সাধারণ খাবার নয়, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক ঔষধ যা ৩০০-এরও বেশি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে বলে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।

